ফেসবুকে বড় বড় কোম্পানি ও ব্রান্ড ছাড়াও, বিভিন্ন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, দোকান, সামাজিক সংগঠন, রাজনৈতিক সংগঠন, স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, ইভেন্ট, শিল্প, সংস্কৃতি ইত্যাদি নিয়ে অসংখ্য পেজ রয়েছে। এবং এ সকল পেজ গুলো থেকে প্রতিনিয়ত পোস্ট এর কারনে অনেক সময় প্রয়োজনীয় পেজ বা পোষ্ট গুলো চোখের আড়ালে থাকে বা দেখা হয় না। তাই নিজের পেজের পোষ্টগুলো যেন সবাই দেখতে পারে, প্রয়োজনীয় তথ্য যেন সকলের কাছে পৌছানো যায় এবং পেজটিকে অন্য পেজ থেকে আলাদা ও আকর্ষনীয় করে তুলতে চাইলে কিছু কৌশল অনুসরন করতে হয়।
নিচে কৌশল গুলো তুলে ধরা হলঃ
ফেসবুক পেজ এর কাভার ছবিঃ
আমরা যারা অনলাইন ইউজ করি এবং ওয়েবসাইট ডিজাইন, ডেভেলপ, সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং ইত্যাদি নিয়ে ঘাটাঘাটি করি, কাজ করি তারা অবশ্যই রেস্পন্সিভ ওয়েব ডিজাইন সম্পর্কে ধারনা রাখি। এই রেস্পন্সিভ ওয়েব ডিজাইন এর কারনে ফেসবুক এর ডেস্কটপ সাইট এ ছবির রেজুলেশন ও মোবাইল সাইট এর ছবির রেজুলেশন সবসময় ভিন্ন দেখা যায়।
খেয়াল করে দেখবেন আপনি ডেস্কটপ এর জন্য ফেসবুক পেজ এ যে কাভার পিক দিবেন মোবাইল এ তা সম্পূর্ন দেখা যাচ্ছে না, বা অনেক খারাপ দেখাচ্ছে, পাশে বা নিচে আপনার প্রয়োজনীয় তথ্য কেটে যাচ্ছে। এর কারন হচ্ছে আমরা সবসময় না জেনে যে কোন একটি সাইজ এর ব্যানার অথবা ৮৫১x৩১৫, ৮৫১x৪৬৫ (মোবাইল থেকে), ৮২৮x৩১৫ পিক্সেল এই সাইজ এর ছবিগুলো কাভার ফটো তে দিয়ে দেই। বর্তমানে ফেসবুক কাভার ডেস্কটপ এর জন্য উপযুক্ত সাইজ হচ্ছে ৮২৮x৩১৫ পিক্সেল এবং মোবাইল এর জন্য ৮২৮x৪৬৫ পিক্সেল। অর্থাৎ আমরা যদি ডেস্কটপ এর সাইজ অনুযায়ী ছবি আপলোড করি তাহলে তা মোবাইলে ভাল দেখাবে না, আর মোবাইল এর জন্য করলে ডেস্কটপে ভাল দেখাবে না।
তাই আমাদের কে এমন একটি কৌশল অবলম্বন করতে হবে যেন একটি নির্দিষ্ট সাইজ এর ছবি দিয়ে দুটি ডিভাইস এই সুন্দর করে দেখানো যায়। প্রথমে নিচের টেমপ্লেট টি লক্ষ করিঃ
উপরের টেমপ্লেট টি থেকে দেখা যাচ্ছে যে ফেসবুক পেজ এ কাভার ফটো দেয়ার জন্য আপনাকে ৮২৮x৪৬৫ পিক্সেল এর একটি ছবি নিতে হবে। এর পর আপনি আপনার গুরুত্বপূর্ন তথ্য গুলো ৩১৫ পিক্সেল উচ্চতার মধ্যেই রাখবেন। তাহলে সেটি মোবাইল এবং ডেস্কটপ দুটি ক্ষেত্রেই সুন্দর দেখাবে। এবার নিচের উদাহরণ টি দেখুন।
উপরের ছবিতে গুরুত্বপূর্ন তথ্য এবং ডিজাইনগুলো ৮২৮ x৩১৫ পিক্সেল এর মধ্যে রাখা হয়েছিল, তাই ছবিটি ডেস্কটপ এবং মোবাইল দুই ক্ষেত্রেই ভাল দেখাচ্ছে।
ফেসবুক পেজ এর প্রোফাইল ছবিঃ
আমরা লক্ষ করলেই দেখতে পাই যে ফেসবুক পেজ এর প্রোফাইল পিক বর্গ আকৃতির, কিন্তু এই বর্গ আকৃতির যে কোন সাইজ দিলেই ছবিটি সুন্দর দেখাবে না। ছবির সাইজ বেশী ছোট বা বেশী বড় হয়ে গেলে তা প্রোফাইল পিক এ সুন্দর দেখাবে না, ঝাপসা দেখায়। ফেসবুক প্রোফাইল ছবি আপলোড করা হলে তা ডেস্কটপে ১৬০x১৬০ পিক্সেল এবং মোবাইলে ১২৮x১২৮ পিক্সেল দেখায় কিন্তু ১৮০x১৮০ পিক্সেল এর ছোট ছবি আপলোড করা যায় না। তাই ছবি আপলোড করার সবচেয়ে ভাল সাইজ হলো ৩৬০x৩৬০ পিক্সেল। আপলোড করার পর তা বিভিন্ন ডিভাইস এ প্রয়োজন মত মিলে যাবে, এবং রেজুলেশন ও ঠিক থাকবে। আবার লক্ষ করবেন আপনার শেয়ার করা প্রোফাইল পিক টাইমলাইনে দেখায়। তাই ছবির সাইজ যদি বেশী ছোট হয় তাহলে সেটি টাইমলাইনে খুব ভাল দেখাবে না।
বিশেষ টিপসঃ কখনো মোবাইল থেকে পেজ এ কাভার পিক, প্রোফাইল পিক বা পোস্ট আপলোড দেয়া ঠিক নয়। তাহলে ছবির কোয়ালিটি নষ্ট হয়ে যায়।
ফেসবুক পেজ এ পোস্ট এর ছবিঃ
ফেসবুক পেজ এ পোস্ট এর ছবি ৫০৪x৫০৪ পিক্সেল এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। তবে ছবি আপলোড এর সময় অবশ্যই ১২০০x৬৩০ পিক্সেল এর ছবি আপলোড করলে সবচেয়ে ভাল।
শেয়ার করা লিংক এ ছবির জন্য উপযুক্ত সাইজ হল ১২০০x৬২৭ পিক্সেল। এটি পেজ এ ৪৭৬x২৭৯ পিক্সেল দেখাবে।
পোস্ট করার কৌশলঃ
ফেসবুক পেজ এ কয়েক ঘন্টা পর পর পোস্ট করার দরকার নেই। শুধুমাত্র গুরুত্বপূর্ন কন্টেন্ট হলে সারাদিন এ কয়েকটি পোস্ট করাই ভাল। ফেসবুক এ পোস্ট করার সবচেয়ে ভাল সময় হল লাঞ্চ এবং ডিনার এর পর। এছাড়া আপনার ফেসবুক পেজ এর ধরন এবং ইউজারদের ইন্টারেস্ট Facebook Insight দেখেও উপযুক্ত সময় ঠিক করা যেতে পারে।
পোস্ট এর কন্টেন্ট ৫০ ক্যারেক্টার এর কম হলে পোস্ট টি সবচেয়ে বেশী মানুষের কাছে পৌছে এবং সবচেয়ে বেশী সাড়া পায়।
পোস্ট এ কোন হ্যাশ ট্যাগ বা গুরুত্বপূর্ন অথবা সম্পর্কিত কোন ব্যক্তিকে ট্যাগ করলে ভালো হয়।
সবসময় বিশেষ দিনগুলো উপলক্ষে পোস্ট করা উচিত। যেমন ১৬ই ডিসেম্বর, ২৬ শে মার্চ, ২১ শে ফেব্রুয়ারী, পহেলা বৈশাখ, ১লা মে ইত্যাদি।
ফেসবুক পেজ ABOUT সেকশনঃ
ফেসবুক পেজ এ ABOUT সেকশন টি খুব ই গুরুত্বপূর্ন। এখানে সকল তথ্য সঠিক ও সুন্দর ভাবে পুরন করা ভালো। Story তে যত বেশী সম্ভব তথ্য দেয়া যায় তত ভাল। এছাড়া ওয়েবসাইট, ইমেইল, প্রোডাক্ট এইসব তথ্য গুলো সঠিক ভাবে দেয়া হলে ইউজার দের আকর্ষন তৈরী হয়।
ফেসবুক পেজ সিকিউরিটিঃ
ফেসবুক পেজ এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন সিকিউরিটি হল পেজ এর এডমিন। একজন এডমিন এর কাছেই থাকে পেজ এর সকল ক্ষমতা। তাই পেজ এর সিকিউরিটি ঠিক রাখার জন্য এডমিনদের অবশ্যই ফেসবুক সম্পর্কে, ফেসবুক এর নিয়ম নীতি সম্পর্কে দক্ষ হতে হবে, এবং অবশ্যই পেজ এর সঙ্গে সম্পূর্নরুপে সম্পর্কিত হতে হবে।
একটি পেজ এ প্রয়োজন অনুযায়ী দুই বা ততোধিক এডমিন রাখা ভাল, এবং বাকীদের বিভিন্ন (এডিটর, মডারেটর ইত্যাদি) রোল ঠিক করে দিতে হবে।
পেজ এর সাথে সম্পর্ক নেই বা প্রয়োজন নেই এমন কাউকে পেজ এর এডমিন বা কোন রোল এ রাখা উচিৎ নয়।
অপ্রাপ্তবয়স্ক, অদক্ষ কাউকে পেজ এর এডমিন রাখা উচিৎ নয়।
যদি পেজ কোন ইমেইল আইডি দিয়ে খোলা হয় তবে অবশ্যই সেই ইমেইল আইডি টি ভেরিফাইড এবং সবসময় ইমেইল আইডি টি পর্যবেক্ষনে রাখা উচিৎ।
পেজ এডমিন এর জন্য সিকিউরিটিঃ পেজ এডমিন দের অবশ্যই ফেসবুক এ তাদের নিজস্ব প্রোফাইলটি নিরাপদ রাখতে হবে। কারন কোন কারনে তাদের আইডি হ্যাক হয়ে গেলে বা ফেসবুক বাতিল করে দিলে পেজ টি হারানোর সম্ভাবনা থাকে। এক্ষেত্রে একাধিক একটিভ এডমিন থাকলে ঝুকি কম থাকে।
ফেসবুক যেন এডমিন দের আইডি বাতিল না করে দেয় সেই জন্য এডমিনদের অবশ্যই নিজের সঠিক নাম প্রোফাইলে ব্যবহার করতে হবে। এডমিন তার পার্সোনাল প্রোফাইলে ফেসবুক এর নিয়ম ভঙ্গ করে এমন কোন পোস্ট, কমেন্টস দেয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। ঘন ঘন পোস্ট করা এবং লাইক দেয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।
ভেরিফাইড ইমেইল আইডিঃ পেজ এডমিন দের নিজস্ব প্রোফাইলে অবশ্যই ভেরিফাইড এবং একটিভ ইমেইল আইডি ব্যবহার করা উচিৎ। তবে একটি প্রাইমারি ইমেইল আইডি রেখে একাধিক ইমেইল আইডি থাকলে খুবই ভাল।
পেজ এর এডমিন দের সিকিউরিটি এর জন্য প্রোফাইলে লগিন এলার্ট অন রাখা উচিৎ।
পেজ এডমিন কে লগিন এপ্রুভাল চালু রাখতে হবে প্রোফাইল এর সিকিউরিটি মজবুত করার জন্য। লগিন এপ্রুভাল এর জন্য একটি সচল মোবাইল নাম্বার ব্যবহার করতে হবে। এক্ষেত্রে ইউজার নেম ও পাসওয়ার্ড দিয়ে লগিন করার পরে ফেসবুক থেকে মোবাইল নাম্বারে একটি কোড নাম্বার মেসেজ হিসেবে আসবে, এবং লগিন করতে হলে সেই কোড নাম্বার টি ব্যবহার করতে হবে। সুতরাং অন্য কেউ লগিন করতে পারবেনা সহজে।
এছাড়াও কোড জেনারেটর চালু রাখাও ভাল, তাহলে কেউ লগিন করতে চাইলে এন্ড্রয়েড মোবাইলে ফেসবুক এপ এ যে একটি কোড দেখাবে, সেটি ছাড়া লগিন করতে পারবে না। মেসেজ এবং কোড জেনারেটর দুটোই যদি চালু থাকে তাহলে দুটোতেই কোড চলে যাবে কিন্তু যে কোন একটি দিয়ে লগিন করা যাবে।
আপনি চাইলে একাউন্ট এর জন্য রিকভারি কোড আগে থেকেই নিয়ে রাখতে পারবেন রিকভারি কোড অপশন থেকে, তাহলে আপনার সাথে যদি আপনার ফোন নাও থাকে আপনি কোড গুলো দিয়ে একাউন্ট লগিন করতে পারবেন। তবে অবশ্যই এই কোড গুলো খুব ই নিরাপদ রাখতে হবে।
আপনার সিকিউরিটি অপশন থেকে সবসময় রিকগনাইজ ডিভাইস গুলো আপডেট রাখা ভাল। আপনি যখন কোন ডিভাইস এ লগিন এপ্রোভাল কোড এর মাধ্যমে লগিন করবেন তখন ফেসবুক আপনাকে ডিভাইসটি ভবিষ্যতের জন্য সেভ করে রাখবেন কিনা তা জিজ্ঞেস করবে, যেন পরবর্তিতে একই ডিভাইসে আর লগিন এপ্রুভ এর জন্য কোড ব্যবহার করতে না হয়। শুধুমাত্র যে সব ডিভাইস আপনি নিয়মিত ব্যবহার করেন সেই ডিভাইস গুলো রিকগনাইজড থাকলে ঝুকি কম থাকে। যে ডিভাইস গুলোতে আপনার একসেস নাই সেই ডিভাইস গুলো অবশ্যই রিমুভ করে দিবেন।
আপনি আপনার তিনজন নির্ভরযোগ্য বন্ধুকে ট্রাস্টেড কন্টাক্টে এড করে রাখতে পারেন, তাহলে আপনার একাউন্ট যদি কখনো হ্যাক হয় বা আপনি পাসওয়ার্ড ভুলে গেলে তারা আপনাকে হেল্প করতে পারবেন।
আপনি আপনার প্রোফাইলে সিকিউরিটি অপশনে কোথায় কোথায় লগিন হয়েছেন তা চেক করতে পারবেন। যদি সন্দেহজনক কোথাও লগিন হয়েছে দেখতে পান, তাহলে END Activity দিয়ে সেখান থেকে লগ আউট করে দিতে পারবেন।
আমরা অনেক সময় ফেসবুক পেজ এ কাস্টম এপ ট্যাব ইউজ করি। এই ধরনের এপস ইউজ করার সময় কিছু গুরুত্বপূর্ন তথ্য একসেস করার অনুমতি দিতে হয়। এই ধরনের এপস গুলো অনেক সময় ঝকিপূর্ন ও ম্যালিসাস হয় যা অনেক সময় একাউন্ট হ্যাক হবার সম্ভাবনা তৈরী করে। তাই এই ধরনের অনুমতি দেয়ার পূর্বে অবশ্যই এপস টি সম্পর্কে ভালভাবে যাচাই করে নেয়া ভাল, এবং এপস টি কি কি অনুমতি নিচ্ছে তাও দেখে নেয়া উচিৎ।
উপরের সিকিউরিটি অপশন গুলো একটিভ থাকলে এবং সঠিকভাবে পেজ ব্যবহার করলে আশা করা যায় ফেসবুক পেজ এবং প্রোফাইল দুটোই নিরাপদ থাকবে।
Leave a Reply